বৃহস্পতিবার, ০৪ Jun ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গত বছরের অক্টোবর মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গাজা উপত্যকা থেকে সব সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করার কথা ছিল ইসরায়েলের। কিন্তু সেনা প্রত্যাহারের পরিবর্তে অবরুদ্ধ এই উপত্যকা জুড়ে স্থায়ী ও ভারী সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে নিজেদের অবস্থান আরও পাকা করছে ইসরায়েলি বাহিনী। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
আল জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিটের একটি অনুসন্ধানে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, গাজার ভেতরে অন্তত ৪০টি সুনির্দিষ্ট ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি স্থায়ী রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সম্পূর্ণ নতুনভাবে ৮টি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘাঁটির নির্মাণকাজ এখনো সক্রিয়ভাবে চলছে।
ভূমিতে এই স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি ইসরায়েলি নেতৃত্বের ক্রমবর্ধমান ভূখণ্ডগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করছে। সম্প্রতি এক সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে, গাজা উপত্যকার সিংহভাগ স্থায়ীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনী তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখায় পিছিয়ে গেছে। এই বাফার ও সামরিক অঞ্চলের আওতায় রয়েছে গাজার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা বর্তমানে হামাসকে চেপে ধরেছি; এখন ৬০ শতাংশ এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে।’ এ সময় উপস্থিত এক ব্যক্তি যখন পুরো গাজা অঞ্চল ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত (অ্যানেক্সেশন) করার দাবি জানিয়ে চিৎকার করেন, তখন নেতানিয়াহু বলেন, ‘ধাপে ধাপে এগোনো যাক। প্রথমত ৭০ (শতাংশ)। আসুন এটা দিয়েই শুরু করি।’
স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, ইসরায়েল কোনো অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ চৌকি নয়, বরং একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করছে।
নতুন করে তৈরি করা এই স্থাপনাগুলো কৌশলগতভাবে গাজার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি উত্তর গাজায়, দুটি মধ্য অঞ্চলে, একটি নেৎসারিম করিডোরের পূর্বে এবং তিনটি দক্ষিণের শহর খান ইউনিসে অবস্থিত।
ভূমি দখলের সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ দেখা গেছে খান ইউনিসে। সেখানে ‘ইস্টার্ন সেমেটারি’ বা পূর্ব কবরস্থানের ধ্বংসাবশেষের ওপর সরাসরি একটি নতুন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বুলডোজার দিয়ে কবরস্থানটি গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে প্রকৌশল কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের ১৮ মে-র মধ্যে সাইটটি পুরোপুরি সামরিক যানবাহনের স্টেশন এবং ব্যারাকে রূপান্তর করা হয়, যা সম্ভবত সেনা আবাসন ও অপারেশনাল বৈঠকের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
উত্তর গাজার বাইত লাহিয়াতেও একই ধরনের দ্রুত সামরিকীকরণের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের ছবিতে যে এলাকাটি সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিল, নভেম্বরের মাঝামাঝিতে সেখানে হঠাৎ করেই মাটি কাটার কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে সেখানে একটি সম্পূর্ণ ঘেরা সামরিক স্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ সুযোগ-সুবিধা তৈরি হয়ে গেছে।
শুধু নতুন ঘাঁটি নির্মাণই নয়, চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত সাময়িকভাবে অবস্থানের জন্য নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ এলাকার পুরোনো ঘাঁটিগুলোরও ব্যাপক আধুনিকায়ন করছে ইসরায়েলি বাহিনী।
গাজা সিটির পূর্বে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটির আয়তন ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই আধুনিকায়নের ফলে সেখানে সাঁজোয়া যানের জন্য নতুন স্টেশন এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক দুর্গ তৈরি করা হয়েছে। মধ্য গাজায় একটি বিদ্যমান সামরিক স্থাপনার চারপাশে গভীর প্রতিরক্ষামূলক পরিখা খনন করতে দেখা গেছে স্যাটেলাইটে, যা দীর্ঘ মেয়াদে সেখানে অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
এই অবকাঠামোগত কৌশলের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে নেৎসারিম করিডোরের চারপাশে। এই পথটি ব্যবহার করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী উত্তর গাজাকে দক্ষিণ গাজা থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আল জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিট এই অক্ষের পূর্ব এবং ঠিক চারপাশে তিনটি পৃথক সামরিক ঘাঁটি চিহ্নিত করেছে, যা উপত্যকার দুই অংশের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের যাতায়াত সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই করিডোরের ঠিক পূর্বে জুহর আদ-দিক এলাকায় ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মাটি কাটার কাজ শুরু করে একটি খোলা জমিকে দ্রুত সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করা হয়েছে।
৪০টি সামরিক ঘাঁটির ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মূল লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনিদের চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলা। মাটির বাঁধ, পরিখা এবং অভ্যন্তরীণ সামরিক সড়কের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ঘাঁটিগুলো ফিলিস্তিনি জনবসতিকে বিভিন্ন দিক থেকে শক্তভাবে ঘিরে রেখেছে।
এই শ্বাসরুদ্ধকর ব্যবস্থার কারণে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের মুক্তভাবে চলাচল বা তাদের নিজেদের জমিতে যাওয়ার সুযোগ মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে ইসরায়েলি মোতায়েন লাইনের কাছাকাছি এলাকাগুলোতে।
এই সম্প্রসারণ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২১ দফার শান্তি পরিকল্পনার ভিত্তিতে ওই চুক্তি হয়েছিল। যার মূল শর্ত ছিল শত্রুতা অবসান, অবিলম্বে ত্রাণ প্রবেশ, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আকরাবাউই বলেন, ৭ অক্টোবরের পর থেকে ‘দখলদারিত্ব, নিয়ন্ত্রণ এবং সীমানা আরও সামনে বাড়িয়ে নেওয়া ইসরায়েলের নিরাপত্তা ডকট্রিন বা নীতির মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।’ তিনি জানান, ইসরায়েলের নতুন কৌশল হচ্ছে ফিলিস্তিনি জনসংখ্যা ও শহুরে অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে শূন্য করে এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া।
আকরাবাউই সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই বিশাল মাত্রার নির্মাণকাজ স্রেফ একটি অস্থায়ী বাফার জোন বজায় রাখার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক কিছুর ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, ‘এই নির্মাণ এবং জনবসতি অবরোধের মাধ্যমে নেতানিয়াহু মূলত আবারও একটি ‘বংশনিধন বা নির্মূলের যুদ্ধ’ শুরু করার অবকাঠামো তৈরি করছেন।’
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৯১৯ জনেরও বেশি, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও সহিংসতা থামেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গত সাত মাসে অন্তত ৯২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৮১১ জন আহত হয়েছেন।
সূত্র: আল-জাজিরা
ভয়েস/আআ